নিম ফল[/caption]
নিম জগৎ/রাজ্য: Plantae বিভাগ: Magnoliophyta বর্গ: Sapindales পরিবার: Meliaceae গণ: Azadirachta প্রজাতি: A. indica দ্বিপদী নাম: Azadirachta indica প্রতিশব্দ: Antelaea azadirachta (L.) Adelb. পরিচিতি: নিম একটি বহু বর্ষজীবি ও চির হরিত বৃক্ষ। আকৃতিতে ৪০-৫০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। এর কান্ড ২০-৩০ ইঞ্চি ব্যাস হতে পারে। ডালের চারদিকে ১০-১২ ইঞ্চি যৌগিক পত্র জন্মে। পাতা কাস্তের মত বাকানো থাকে এবং পাতায় ১০-১৭ টি করে কিনারা খাঁজকাটা পত্রক থাকে। পাতা ২.৫-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। নিম গাছে এক ধরনের ফল হয়। আঙুরের মতো দেখতে এ ফলের একটিই বিচি থাকে। জুন-জুলাইতে ফল পাকে, ফল তেতো স্বাদের।বাংলাদেশের সবত্রই জন্মে তবে উত্তরাঞ্চলে বেশি দেখা যায়। প্রাপ্ত বয়স্ক হতে সময় লাগে ১০ বছর। নিম গাছ সাধারণত উষ্ণ আবহাওয়া প্রধান অঞ্চলে ভাল হয়। মাটির পিওএই ৬.২-৮.৫ এবং বৃষ্টিপাত ১৮-৪৬ ইঞ্চি ও ১২০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রা নিম গাছের জন্য উপযোগী।
ব্যবহার্য অংশ: পাতা, ফল, ছাল বা বাকল, নিমের তেল,বীজ। এক কথায় নিমের সমস্ত অংশ ব্যবহার করা যায়।
চাষাবাদ: নিম সাধারণত সকল জমিতে হয়। বসতবাড়ি, মাঠের জমি, জঙ্গলে জন্মে। ঘন কাদা মাটি এবং শুষ্ক ভুষা মাটিতে ও জন্মে। তবে কালো দোয়াশ মাটি নিম চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। উচচা মাত্রায় সোডিয়াম কার্বনেটম সোডিয়াম বাই কার্বনেট,ক্ষার ও লবানক্ততায় নিম ভাল জন্মে। নীম নার্সরী বেড, কন্টেইনার নার্সারী মাধ্যমে চারা উতপান করা যায়।জুনের ৩০ তারিখ থেকে বীজ বপন শুরু হয়। বর্ষকালের শেষ পর্যন্ত বীজ বপন করা যায়। বীজ নার্সরী বেডে, পলিব্যাগে অথবা সরাসরি জমিতে লাগানো যেতে পারে।নার্সারীতে চারা জন্মানোর ৭-১০ সেমি উচু হলে তা লাগানো উপযুক্ত। সাধারণত বৃষ্টির সময়ে অথবা সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিতে চারা উত্তোলন করা ভালো। ঔষধি গুণাগন: বিশ্বব্যাপী নিম গাছ, গাছের পাতা, শিকড়, নিম ফল ও বাকল ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে পরিচিত। বর্তমান বিশ্বে নিমের কদর তা কিন্তু এর অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে ব্যহারের জন্য। নিম ছত্রাকনাশক হিসেবে, ব্যাকটেরিয়া রোধক হিসেবে ভাইরাসরোধক হিসেবে, কীট-পতঙ্গ বিনাশে চ্যাগাস রোধ নিয়ন্ত্রণে, ম্যালেরিয়া নিরাময়ে,দন্ত চিকিতসায় ব্যাথামুক্তি ও জ্বর কমাতে, জন্ম নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হয়। কফজনিত বুকের ব্যথা: অনেক সময় বুকে কফ জমে বুক ব্যথা করে। এ জন্য ৩০ ফোটা নিম পাতার রশ সামান্য গরম পানিতে মিশিয়ে দিতে ৩/৪ বার খেলে বুকের ব্যথা কমবে। গর্ভবতী,শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এ ঔষধটি নিষেধ। কৃমি: পেটে কৃমি হলে শিশুরা রোগা হয়ে যায়। পেটে বড় হয়। চেহারা ফ্যকাশে হয়ে যায়। এ জন্য ৫০ মিলিগ্রাম পরিমাণ নিম গাছের মূলের ছালের গুড়া দিন ৩ বার সামান্য পানি গরমসহ খেতে হবে। উকুন নাশ: নিমের পাতা বেটে হালকা করে মাথায় লাগান। ঘন্টা খানেক ধরে মাথা ধুয়ে ফেলুন। ২/৩ দিন এভাবে লাগালে উকুন মরে যাবে। অজীর্ণ: অনেকদিন ধরে পেটে অসুখ। পাতলা পায়খানা হলে ৩০ ফোটা নিম পাতার রস, সিকি কাপ পানির সঙ্গে মিশিয়ে সকাল- বিকাল খাওয়ালে উপকার পাওয়া যাবে। খোস পাচড়া: নিম পাতা সিদ্ধ করে পানি দিয়ে গোসল করলে খোসপাচড়া চলে যায়। পাতা বা ফুল বেটে গায়ে কয়েকদিন লাগালে চুলকানি ভালো হয়। পোকা-মাকড়ের কামড়: পোকা মাকড় কামল দিলে বা হুল ফোটালে নিমের মূলের ছাল বা পাতা বেটে ক্ষত স্থানে লাগালে ব্যথা উপশম হবে। দাতের রোগ: নিমের পাতা ও ছালের গুড়া কিংবা নিমের চাল দিয়ে নিয়মিত দাত মাজলে দাত হবে মজবুত, রক্ষা পাবে রোগ। ডায়াবেটিস রোগে: ৫টি গোলমরিচ+১০টি নিম পাতা একত্রে সকালে খালি পেটে খেতে হবে। কৃত বা লিভার ব্যথায় : নিম ছাল ১ গ্রাম+কাঁচা হলুদ আধা গ্রাম+আমলকীর গুড়ো ১গ্রাম একসাথে মিশিয়ে পানি দিয়ে গুলিয়ে সকালে খালিপেটে খেতে হবে+১সপ্তাহ পর্যন্ত। জন্ডিসে: বাচ্চাদের জন্য ৫-১১ ফোঁটা, বয়স্কদের জন্য ১ চামচ রস একটু মধু মিশিয়ে খালি পেটে খেতে হবে প্রতিদিন সকালে। ব্রণ সমস্যা: মুখে ব্রণের সমস্যা থাকলে নিম পাতা বেঁটে ব্রণে লাগিয়ে দিন। জাদুর মতো কাজ হবে।
অন্যান্য ব্যবহার: নিমের পাতা থেকে আজকাল প্রসাধনীও তৈরি হচ্ছে। কৃমিনাশক হিসেবে নিমের রস খুবই কার্যকর।নিমের কাঠ খুবই শক্ত। এ কাঠে কখনো ঘুণ ধরে না। পোকা বাসা বাঁধে না। উইপোকা খেতে পারে না। এ কারণে নিম কাঠের আসবাবপত্রও তৈরি করা হচ্ছে আজকাল। নিমের পাতা ধানের গোলার মধ্যে রেখে দিলে পোকা মাকড় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
নিমপাতার বালাইনাশক:
নিম গাছের বিভিন্ন অংশ দিয়ে তৈরি জৈব বালাইনাশক বেশ কিছু রোগ ও পোকার উপর বিভিন্নভাবে কাজ করে। যেমন- এই বালাইনাশক বিকর্ষক, কীটনাশক, ব্যাকটেরিয়ারোধী, ছত্রাকরোধী, পোকার ডিম বিনাশকারী, পোকার বংশ বৃদ্ধিরোধকারী এবং জীবাণু থেকে শস্য ও শস্যদানা রক্ষাকারী হিসেবে কার্যকর। মাটিতে অবস্থানকারী ছত্রাকের উপর এই বালাইনাশক কার্যকর, তাই সেপ্রর সময় মাটিও যদি ভালভাবে ভিজিয়ে দেয়া যায় তাহলে মাটিবাহিত রোগের প্রকোপ কমে। মাত্র ১০ থেকে ১২ কেজি নিমপাতার বালাইনাশক দিয়ে ০.৪ হেক্টর (প্রায় ১ একর) জমিতে সেপ্র করা যায়। নিমের নির্যাস তৈরি সময় লক্ষ্য রাখতে হয় এটি দেখতে দুধের মত সাদা, কখনোই বাদামি রঙয়ের নয়। নিমপাতা ১ থেকে ২ কেজি থেঁতলানো নিমপাতা একটি মাটির পাত্রে নিয়ে তাতে ২ থেকে ৪ লিটার পানি দিতে হয়। এরপর কাপড় দিয়ে পাত্রের মুখ ভালভাবে বেঁধে ৩ দিন রাখতে হয়। ৩ দিন পর মিশ্রণটি ভালভাবে ঝাঁকিয়ে নিয়ে দ্রবণটি একটি পাতলা কাপড়ে ছেঁকে নিতে হয়। ছেঁকে নেয়া দ্রবণ থেকে ১ লিটার পরিমাণ নির্যাস ৯ লিটার পানির সাথে মেশাতে হয়। মিশ্রিত দ্রবণে ১০ গ্রাম গুঁড়া সাবান বা তরল সাবান ভাল করে মিশিয়ে নিয়ে পাতলা কাপড়ে ছেঁকে নিলেই তৈরি হয়ে যায় নিমের বালাইনাশক। এই মিশ্রণের সাথে সাবান গুঁড়া বা তরল সাবান মেশানোর সময় ১০ গ্রাম পরিমাণ তুঁতে একটি পাতলা কাপড়ের পুঁটলিতে বেঁধে নেড়েচেড়ে মেশালে এটি ছত্রাকের উপরও একই সাথে কার্যকরী হয়। তৈরি নিমজাত বালাইনাশক আক্রান্ত অংশসহ পুরো গাছেই ভালভাবে ¯েপ্র করে ভিজিয়ে দিতে হয়। নিমবীজ ৩ থেকে ৫ কেজি নিমবীজ এমনভাবে থেঁতলিয়ে নিতে হয় যেন ভেতরের অংশ থেকে তেল বের হয়ে না আসে। এরপর ভাঙা বীজগুলো একটি অধাতব পাত্রে রেখে ১০ লিটার পরিষ্কার পানি যোগ করে পাত্রের মুখ কাপড় দিয়ে বেঁধে দিতে হয়। ৩ দিন এভাবে রেখে দেয়ার পর পাত্রের মধ্যস্থ বীজসহ পানি ভালভাবে ঝাঁকিয়ে নিয়ে পাতলা কাপড়ের উপর ছেঁকে নিতে হয়। ছেঁকে নেয়া পানি থেকে ১ লিটার পরিমাণ দ্রবণ নিয়ে তার সাথে আরো ৯ লিটার পানি মেশাতে হয়। ১০ গ্রাম সাবান গুঁড়া ও ১০ গ্রাম তুঁতে একটি কাপড়ের পুঁটলিতে নিয়ে সেই মিশ্রণে যোগ করতে হয়। মিশ্রিত দ্রবণ ভালভাবে ঝাঁকিয়ে নিয়ে পাতলা কাপড়ে আবারো ছেঁকে নিতে হয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত মিশ্রিত দ্রবণ আক্রান্ত গাছে/ক্ষেতে এমনভাবে ¯েপ্র করতে হয় যেন পুরো গাছ ভিজে যায়। দ্রবণ আলাদা করার পর যে ভাঙা নিমবীজের যে শক্ত অংশ পাওয়া যায় তা গুঁড়া করে মাটিতে মিশিয়ে দিলে মাটিস্থ পোকার উপর কাজ করে। নিমবীজ গুঁড়া পুষ্ট ও শুকনো ৩ থেকে ৫ কেজি নিমবীজ এমনভাবে গুঁড়া করে পাউডারের মত করতে হয় যেন এগুলো থেকে কোনো তেল বের হয়ে না আসে। সবটুকু পাউডার ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১০ মিনিট ধরে ভালভাবে নাড়তে হয়। এরপর কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা (তবে ১৬ ঘণ্টার বেশি নয়) স্থির অবস্থায় রেখে দিতে হয়। এরপর আরো একবার ১০ মিনিট ধরে মিশ্রণটি নাড়তে হয়। শেষে এরসাথে ৫ মিলিলিটার সাবান গুঁড়া যোগ করতে হয়। এভাবে তৈরি হয়ে যায় নিমজাত বালাইনাশক। মিশ্রিত নির্যাস ছেঁকে নিয়ে তা থেকে ১ লিটার পরিমাণ দ্রবণের সাথে আরো ৯ লিটার পরিষ্কার পানি মেশাতে হয়। দ্রবণটি আক্রান্ত অংশসহ সম্পূর্ণ গাছেই ভালভাবে ¯েপ্র করে ভিজিয়ে দিতে হয়। দ্রবণ আলাদা করার পর যে অংশ পাওয়া যায় তা শুকিয়ে মাটিতে ছিটিয়ে ব্যবহার করা যায়, যা মাটিস্থ পোকার উপর কাজ করে। যেসব পোকার উপর কার্যকর মাটির নিচে অবস্থানকারী কাটুইপোকা, উরচুঙা ও সাদাকীড়া, পাতার রস শোষনকারী জাব পোকা, থ্রিপস, ছাতরা পোকা, স্কেল পোকা, পাতা সুরঙ্গকারী পোকা, গাছ ফড়িং, পাতা ফড়িং ও সাদা মাছি, পাতা মোড়ানো পোকা, ফল ছিদ্রকারী পোকা, বিছা পোকা, ফ্লি বিটল, চ্যাপার বিটল, কপির সরুই পোকা (ডায়মন্ড ব্যাক মথ) এবং শামুক ইত্যাদি নিমজাত বালাইনাশকের প্রভাবে গাছকে আক্রমণ করে না বা নিজেদের কর্মক্ষমতা হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কোনো কোনো পোকা ক্ষুধামন্দায় ভুগে মরে যায়। কিছু পোকা প্রয়োগ করা স্থান থেকে দূরে সরে যায়। নিমজাত বালাইনাশক তৈরির পরপরই প্রয়োগ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়। তৈরির পর যত দেরি হয় এর কার্যকারিতাও তত কমতে থাকে। খুব সকালে বা শেষ বিকালে নিমজাত বালাইনাশক ¯েপ্র করতে হয়। কখনোই কড়া রোদে বা বৃষ্টির আগে ¯েপ্র করা ঠিক নয়। পরাগায়নের জন্য উপকারী প্রজাপতি, মৌমাছি, বোলতা, লেডি বার্ড বিটল-এর জন্য নিজজাত বালাইনাশক ক্ষতিকর নয়। মানুষ, পশু-পাখি এবং পরিবেশের জন্য নিমজাত বালাইনাশক মোটেই ক্ষতিকর নয়। মাটিতে অবস্থানকারী কেঁচোর কোনো ক্ষতি করে না। তবে ফুল ফোটার পর নিমজাত বালাইনাশক ¯েপ্র করা উচিত নয়।
বাংলা ব্লগ
দেড় যুগ আগে বাংলাদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো শীতপ্রধান দেশের ফল স্ট্রবেরির পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মনজুর হোসেন। পরবর্তীতে তার গবেষণার মাধ্যমে স্থানীয় আবহাওয়ার উপযোগী উন্নতজাত উদ্ভাবন হলে বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় এ চাষ। বরেন্দ্র অঞ্চলের মাঠে মাঠে স্ট্রবেরির চাষ বৃদ্ধি যেন ভুলিয়ে দিয়েছে একসময় এই অঞ্চলে এর পরিচিতি ছিলো ‘বিদেশী ফল’ হিসেবে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভালো বাজারমূল্য তৈরি হওয়ায় প্রতিবছরই রাজশাহী ও আশপাশের অঞ্চলে বাড়ছে এই চাষ। এমনটাই জানিয়েছেন এই এলাকার উদ্যোক্তারা।
অনেকে ব্যাক্তিগত উদ্যোগেও ষ্ট্রবেরী চাষ শুরু করেছেন। নরসিংদির নজরুল ইসলাম জানান, সাইপ্রাস থেকে আমদানি করা স্ট্রবেরীর চারাগাছ প্রতি একরে প্রায় ২৪ হাজার রোপণ করা হয়ে থাকে। অক্টোবরে এই চারা গাছ রোপণ করা হয়। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে স্ট্রবেরী পাওয়া যায়। বিভিন্ন পুষ্টি গুণে পরিপূর্ণ স্ট্রবেরী চাষ করার জন্য ইতোমধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের মধ্যে বেশ উৎসাহ ও আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। প্রতি কেজি ৪শত টাকা হারে স্ট্রবেরী বিক্রি হয়। গত এক বছরে নজরুল ইষরাম সাড়ে চার লাখ টাকা আয় করেছেন। প্রতিদিন তিনি ১০ কেজি করে স্ট্রবেরী বিক্রি করে থাকেন। এলাকার অনেক তরুণ তার কাছ থেকে চারা গাছ নিয়ে স্ট্রবেরী উৎপাদন করছেন বলে তিনি জানিয়েছেন।
Strawberry Gaibandhaনজরুল ইসলাম এর সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে নরসিংদী জেলার বেলাবো উপজেলার শাল্লাবাদ ইউনিয়নে ষ্ট্রবেরী চাষ করে কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে বেশ লাভবান হচ্ছেন। বিভিন্ন পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ লিচুর মতো সদৃশ স্ট্রবেরী চাষ করতে এগিয়ে আসছে অনেক তরুণ কৃষক। এলাকার কৃষকদের মাঝে বেশ সাড়া জাগিয়েছে।
পাহাড়ের মাটি উপযুক্ত হওয়ায় ষ্ট্রবেরী চাষে সম্ভাবনা পাহাড়েই সবচেয়ে বেশী। রাঙ্গামাটি শহরের নতুন পুলিশ লাইন সুখী নীলগঞ্জের বিস্তির্ন এলাকায় জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে সুস্বাদু ষ্ট্রবেরী ফলের পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা আসায় পার্বত্য অঞ্চলে ষ্ট্রবেরী চাষে অনেকে উদ্বুদ্ধ হবেন বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষিবিদরা। অন্যান্য ফলের পাশাপাশি নতুন ফল ষ্ট্রবেরী চাষে সফল হয়েছে রাঙ্গামাটি পুলিশ বিভাগ। ষ্ট্রবেরী চাষের সফলতায় সকলে খুব খুশী। ষ্ট্রবেরী চাষের সম্ভাবনাকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগানোর জন্য আগামীতে সুখী নীল গঞ্জ এলাকায় বড় আকারে বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন রাঙ্গামাটি সদরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ আশরাফুজ্জামান। তিনি জানান, পাহাড়ে ষ্ট্রবেরী চাষের সম্ভাবনাকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আরো উদ্যোগী হচ্ছে রাঙ্গামাটি পুলিশ বিভাগ। পুলিশের নিজস্ব এ জমিতে গড়ে উঠা বিশাল বাগানগুলোর ব্যাপকতা বৃদ্ধির জন্য সবসময় মনিটরিং করছেন পুলিশ বিভাগের সিনিয়র অফিসাররা। তারা জানান, পার্বত্য এলাকায় উৎপাদিত ষ্ট্রবেরী চাষের সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে তা বাইরে ও রপ্তানী করা সম্ভব। তাছাড়া এখানে অন্যান্য নতুন নতুন ফলের উৎপাদনের জন্যও নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ।
নওগাঁর মাহবুব আলম ২০০৩ সাল কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে ইসলামিক ষ্টাডিক নিয়ে এম পাশ করেন । পড়ালেখার সময় থেকে কৃষিতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন । তাই পাশ করার পর চাকরীর পিছনে না ছুটে (রাবি) বোটানি বিভাগের অধ্যক্ষ ড, মঞ্জুর হোসেন এর কাছে মাহবুব । ড. মঞ্জুর এ সময় মাহবুব কে বলেন ষ্ট্রবেরী চাষ করার কথা। ড, মঞ্জুর এ বিষয়ে দীর্ঘ দিন থেকে গবেষনা চালিয়ে আসছিলেন । উজ্জল সম্ভবনা লক্ষ করে মাহবুব কে ষ্ট্রবেরীর ৫ শ চারা দিয়ে চাষ পদ্ধতি হাতে কলমে শিখিয়ে দেন। এটা ছিল ২০০৮ সালের মাহবুবের যাত্রার কথা ।
strawberry 1প্রথমে তিনি পরিক্ষা মুলক ৫ কাঠা জমিতে এসব চারা রোপন করেন। সে বছর সব খরচ বাদ দিয়ে মাহবুব আয় করেন প্রায় ১ লাখ টাকা। এর পর থেকে ষ্ট্রবেরী চাষের আগ্রহ বেড়ে যায় সম্প্রসারন করেন ষ্ট্রবেরী চাষ। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় মাহবুব চারা সরবরাহ কওে প্রসার করেন ষ্ট্রবেরী চাষের পরিধি । চলতি বছর জেলার মান্দা ও নওগাঁ সদরের শিবপুর নামক স্থানে চাষ করা হয়েছে ষ্ট্রবেরী। প্রায় ১৬ বিঘা জমিতে চাষ করা ষ্ট্রবেরীর পরিচর্যা ও উৎপাদন প্রক্রিয়া দেখভাল করছেন মাহবুব আলম । নিবির পরিচর্যা ও কঠোর নজরদারীর মাঝে গড়ে উঠে বীজ থেকে চারা। মাহবুব আলম জানান, দিন দিন বাজার প্রসার হচ্ছে ষ্ট্রবেরীর । প্রথম দিকে বাজার জাত করার কিছু সমস্যা ছিল। এখন তা আর নেই । নওগাঁ থেকে রাজধানী সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাচ্ছে এসব ষ্ট্রবেরী । মাহবুব নিজে শিবপুর নামক স্থানে ৩ বিঘা জমিতে চাষ করেছেন ষ্ট্রবেরী । বারি-৩ নামের আগের জাতের সাথে হাইব্রিড নামের আরো একটি জাত এবার চাষ করে ব্যাপক ফলন পাচ্ছেন বলে জানান। হাইব্রিড জাতের ষ্ট্রবেরীর গাছে প্রতি থোকায় ১৬/১৮ টি ষ্ট্রবেরী ধরেছে । তা ছাড়া এসব ষ্ট্রবেরী আকার অনেকটা বড় । তিন বিঘা জমি থেকে এবার মাহবুব শুধু আয় করবে সাড়ে তিন লাখ টাকা এমন এমন আশা করছেন তিনি ।
ষ্ট্রবেরী চাষ করে ঈশ্বরদীর মাঝদিয়া গ্রামের রবি ৩ বছরে ২৫ লক্ষাধিক টাকা লাভ করেছেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে ষ্ট্রবেরী হতে বিপুল পরিমান অর্থ উপার্জনের ঘটনা যুবক রবি’র জীবনে আলাদিনের আশ্চর্যজনক চেরাগের মতই কাজ করেছে। রবি’র এই সাফল্য এলাকাবাসী ছাড়াও দেশের অন্য এলাকার যুবকদের মধ্যে প্রভাবিত হয়ে আশার আলো জাগাতে সক্ষম হয়েছে। ষ্ট্রবেরী চাষ করার কারণে এখন এলাকার সকলেই তাকে ষ্ট্রবেরী রবি বলে ডাকেন।
starwberry2ঈশ্বরদী শহর হতে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দূরে পদ্মা নদীর পশ্চিম পাড়ে মাঝদিয়া গ্রামে রবিউল ইসলাম রবি’র বসতভিটা। ছয় ভাইয়ের মধ্যে ৩২ বছর বয়সী রবি তৃতীয়। ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ হতে স্নাতক পাশ করার পর কর্মসংস্থান করতে না পেরে বাবা ও ভাইদের সহযোগিতায় ইতালির উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। আদম বেপারীর প্রতারণায় রবি কুয়েত যেয়ে আটকে পড়েন। সেখানে ১৩ মাস অবস্থানের পর সর্বশ্বান্ত হয়ে রবি বাড়ি ফিরে আসেন এবং বেকারত্বের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত হন। এই সময় জাতীয় একটি পত্রিকায় ষ্ট্রবেরী চাষ সম্পর্কে প্রকাশিত নিবন্ধ পড়ে রবি আকৃষ্ট হন। পত্রিকার সূত্র ধরে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. মনজুর সাহেবের সাথে যোগাযোগ করেন।
২০০৯ সালের জুন মাস নাগাদ রবি ড. মনজুরের নিকট হতে প্রতিটি ২০ টাকা দরে এক হাজার রানার (ষ্ট্রবেরীর চারা) কিনে পৈত্রিক ১ বিঘা জমিতে চাষ শুরু করেন। ষ্ট্রবেরী মূলত: শীত প্রধান দেশের আবহাওয়া উপযোগী হওয়ার কারনে প্রথমেই খরা পীড়িত হয়ে সাতশ’ চারা মারা যায়। জীবিত তিনশ’ চারা স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তায় বিশেষ পরিচর্যা করে টিকিয়ে রাখা হয়। এই তিনশ’ চারা গাছ হতে ষ্ট্রবেরী ফল উৎপাদনের পাশাপাশি প্রায় ৫০ হাজার রানার (চারা) তৈরী হয়। এ পর্যায়ে রবি নিজেই ২৫ হাজার চারা প্রতিটি ১৫-২০ টাকা দরে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। এ সময় চাষের পরিধি ১ বিঘা হতে ৬ বিঘা জমিতে সম্প্রসারিত হয় এবং রবি নিজের জমিতেই অবশিষ্ঠ ২৫ হাজার চারা রোপন করেন।
রবি জানায়, এখনও তার জমির ষ্ট্রবেরী প্রতিদিনই ঢাকায় পাঠিয়ে বিক্রি করছেন। ফল ও চারা বিক্রি করে চলতি মৌসুমে ৮ লাখ টাকারও বেশী লাভ হবে বলে রবি জানিয়েছেন। ষ্ট্রবেরী চাষ করতে যেয়ে প্রথম পর্যায়ে অজ্ঞতার কারণে খরচের পরিমান বেশী হলেও এখন উৎপাদন ব্যয় অনেক কমে গেছে।
গত কয়েক বছর ধরে জয়পুরহাটের বিভিন্ন এলাকায় চাষ হচ্ছে ষ্ট্রবেরী। তুলনামূলক ভাবে অধিক লাভজনক হওয়ায় দিন দিন জেলার কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে পড়ছেন ষ্ট্রবেরী চাষে। সদর উপজেলার খেজুরতলী গ্রামের ১৫ জন শিক্ষিত বেকার যুবক ষ্ট্রবেরী চাষের মাধ্যমে তোদের ভাগ্য ফেরালেন। তারা গড়ে তুলেছেন ষ্ট্রবেরী ভিলেজ। অন্যান্য ফসলের তুলনায় বেশি লাভজনক হওয়ায় জয়পুরহাট সদর ও আক্কেলপুর উপজেলার চাষিরা স্ট্রবেরী ফল চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠাসহ ভাল সাফল্যও পেতে শুরু করেছেন। জয়পুরহাট সদরের জামালপুর ইউপির খেজুরতলী নামক স্থানে ১৫ জন বেকার যুবক স্ট্রবেরী চাষে তাদের ভাগ্য ফিরিয়েছে। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে ষ্ট্রবেরী ভিলেজ। আগামী বছর জয়পুরহাট সদরে হতে যাচ্ছে শতাধিক যুবকের ২০০ বিঘার রেড গ্রীন স্ট্রবেরী ভিলেজ।
Strawberryসদর উপজেলার খেজুরতলী গ্রামের শিক্ষিত বেকার যুবক আব্দুল ওয়াদুদ, হামিদ, রবিউল ইসলাম ও ফারুক হোসেন গত বছরের জুন মাস নাগাদ চারা সংগ্রহ করে একই বছরের অক্টোবর মাসে জমি প্রস্ত্তত পর চারাগুলো রোপণ করেন। এর পর পরিচর্যায় চলতি বছরের জানুয়ারী থেকেই তাদের ৪ জনের একই প্লটের ১০ বিঘা জমিতে প্রতিদিন ৭০০ কেজি স্ট্রবেরী ফলের ফলন পেতে থাকেন। প্রথম অবস্থায় প্রতি কেজি ৭০০ টাকা দরে, ফেব্রুয়ারীতে ৬০০ টাকা দরে ও মার্চের প্রথম ১০ দিনে ৫০০ টাকা দরে তাদের উৎপাদিত স্ট্রবেরী ফল ঢাকার কাওরান বাজার ও বাদামতলীর আড়তে এবং খুলনার ডাক বাংলার আড়তে বিক্রয় করেন। এর পর থেকে ফলনের পড়ন্ত মরসুমে তারা কেজি প্রতি দর পাচ্ছেন ২০০ টাকা। এখন পড়মত্ম ফলনের সময়ে তারা প্রতিদিন উৎপাদন পাচ্ছেন ৫০০ কেজি করে। ১০ বিঘা জমিতে তাদের খরচ হয়েছে ১০ থেকে ১৫ লক্ষ টাকা। তবে তাদের আয় হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ লক্ষ টাকা বলে জানালেন তারা।
স্ট্রবেরি চাষে লাভের দেখা মেলায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যয়বহুল আবাদ হওয়ায় এ খাতে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দিলে উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি তৈরি হবে রপ্তানির সম্ভাবনা। স্ট্রবেরি চাষে যুক্তরা জানান, লাভের দেখা পাওয়ায় উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়লেও এ চাষে খরচ বেশি হওয়ায়, পুজিঁর অভাবে মাঝেমাঝেই দমে যেতে হয় তাদের অনেককেই। তাই ব্যাংকগুলোর সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করলে এ চাষ আরো কয়েকগুণ বাড়তে পারে বলে মনে করেন তারা।