" me and toy same same !"

কিছুক্ষণ আগে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার ছবিটি দেখলাম। ছবিটা দেখে আমার মাঝে একটা মিশ্র অনুভূতি তৈরি হয়েছে। কিছুটা ভালো লাগার এবং অনেকটাই কষ্ট লাগার অনুভূতি। ভালো কেন লাগলো সেটা লিখবনা। কষ্ট লাগা নিয়ে কিছুটা লিখব। এই কষ্ট লাগার কারণে মাথার মধ্যে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এই ছবি নির্মাণের পেছনে পরিচালকের উদ্দেশ্য কি? নারীর প্রগতি তথা নারীর “আধুনিকায়ন” নাকি লিভ টুগেদারের চূড়ান্ত এবং করুণ পরিণতি তুলে ধরা?
পরিচালকের উদ্দেশ্য যদি প্রথমটি হয় (নারীর প্রগতি) এবং এর দ্বারা বিবাহ প্রথার পরিবর্তে লিভ টুগেদারকে নারীর অগ্রগতির উপায় হিসেবে উপস্থান করা হয় তাহলে আমার কষ্ট লাগার অনুভূতির ষোলকলা পূর্ণ হবে। আমার মনে হয় আমাদের দেশে নারীদেরকে পশ্চিমা সংস্কৃতির ‘এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ড দ্বারা কি বুঝাতে চাচ্ছি তা একটা উদাহরণ দিয়ে পরিষ্কার করে নিই- আমার তিন বছর বয়সী ভাতিজা টিভিতে মারামারি দেখে এটার এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছে তার দাদুর উপর। মারাত্মক ঘটনা। শুধু মারত্মক না অতি মারাত্মক ঘটনা। সে বাইরে যা ই দেখে বাসায় এসে এক্সপেরিমেন্ট চালায় তার দাদুর উপর। এখানে তার দাদু মানে আমার মা হচ্ছে এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ড। আমাদের দেশের নারিবাদীরা পশ্চিমা সংস্কৃতির সব কিছুতেই মুগ্ধ হয়। তাদের মুগ্ধ হওয়ার বিস্ময়কর ক্ষমতা দেখে আমিও মুগ্ধ হই। পশ্চিমা নারীদের জন্য প্রণীত ‘সিডো’ আইন দেখে তারা মুগ্ধ হয়ে নির্বোধের মত এটার এক্সপেরিমেন্ট চালায় আমাদের দেশের নারীদের উপর। এখন আবার কেউ কেউ তাদের লিভ টুগেদার কালচার দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছে যে এই সর্বনাশা প্রথা আমাদের সমাজে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালাচ্ছে। আর তৎপরতা চালাবেই বা না কেন? বিয়ে করলেতো সারাজীবন একজনকে নিয়েই থাকেতে হয়। আর লিভ টুগেদারে তো যখন যার সাথে ইচ্ছা তার সাথেই থাকা যায়। মজার উপর মজা। হায়রে নারিবাদী! হায়রে নারিপ্রগতির প্রেমিক!
এদেরকে আসলে নারিপ্রগতির প্রেমিক না বলে নারীর দুর্গতির প্রেমিক বললে বোধহয় নারীজাতির কিছুটা উপকার হয়। তাহলে নারীরা তাদের নিজেদের সম্পর্কে কিছুটা সচেতন হতে পারবে। অযথা চিলের পেছনে না ছুটে কানে হাত দিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে কান আছে নাকি নেই।
আমাদের সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা সবকিছুই নারীকে এগিয়ে দিচ্ছে গানিতিক হারে আর পিছিয়ে দিচ্ছে জ্যামিতিক হারে।(গানিতিক হার-১,২,৩,৪,৫।জ্যামিতিক হার-১,২,৪,৮,১৬।)আর এ বিষয়টি সুচিন্তাশীল ব্যক্তি মাত্রই স্পষ্টত প্রতীয়মান। শিক্ষা ক্ষেত্রে নারীকে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ, নারীর জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে গৃহিত পদক্ষেপ,নারী নির্যাতন রোধে প্রনীত আইন ইত্যাদি ইত্যাদি যেমন নারীর এগিয়ে চলার পথকে মসৃণ করছে,নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করছে তেমনি নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপনের যে প্রবণতা চারদিকে চলছে তা এবং নারিবাদীদের বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্টের শিকার হয়ে তারা তাদের মর্যাদা হারাচ্ছে আর পিছিয়েও যাচ্ছে বহুগুনে। রাস্তার পাশের বিলবোর্ডগুলোর বিজ্ঞাপনে যখন দেখি টেলিভিশন,ফ্রিজের পাশে পোজ দিয়ে সুন্দরী একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে তখন আমি আশ্চর্য হই। ঐ দিন টিভিতে নিউ মডেলের একটা গাড়ির বিজ্ঞাপন দেখলাম। উগ্র পোশাক পরে গাড়ির গায়ে হাত দিয়ে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই পোশাক না থাকলে মনে হয় উগ্রতা কিছুটা কমতো। গাড়ির বিজ্ঞাপনে উগ্র পোশাক পরিহিতা মেয়ের কি দরকার তা আমি ভেবে পাইনি। ক্রিকেট মাঠে প্লেয়াররা চার ছয় মারলে চিয়ার্স লিডারদের শরীর দেখিয়ে নগ্ননৃত্যের কি মানে তাও আমি খুঁজে পাইনি। এ গুলো কি নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করছেনা????
নারী স্বাধীনতা। আমাদের পরম কাঙ্ক্ষিত এক বিষয়। মাঝে মাঝে আমাদের দেশের ‘নারীবাদীদের’ কর্মকাণ্ড দেখে আমি এ শব্দ দুটি দ্বারা আসলে কি বুঝানো উদ্দেশ্য এ নিয় সন্দিহান হয়ে পড়ি। নারীর ‘ঘর’ ছেড়ে রাস্তায় বের হয়ে আসা, পুরুষের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কেনাকাটা করতে পারা এবং ধাক্কাধাক্কি ও দর কষাকষিতে পুরুষকেও ছাড়িয়ে যাওয়া, ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে গাড়িতে উঠতে পারা ইত্যাদি ইত্যাদির মানে যদি হয় নারীর স্বাধীনতা তাহলে আমি বলবো নারীর এই স্বাধীনতা শতভাগ অর্জিত হয়েছে। এ নিয়ে এখন আর চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে নারীরা শতভাগ সফলতার পরিচয় দিয়েছে। আর নারী স্বাধীনতার মানে যদি হয় পত্রিকার পাতায় কোন নারী ধর্ষিত হওয়ার খবর থাকবেনা, শিক্ষকরুপী কোন পশুর দ্বারা ছাত্রী ধর্ষিত হবেনা, গাড়িতে কোন মেয়েকে ধর্ষণের শিকার হতে হবেনা, চার বছরের অবুঝ কন্যা শিশুকে ধর্ষণের বোঝা মাথায় নিয়ে বড় হতে হবেনা, এসিডে কোন নারীর মুখ ঝলসে যাবেনা, হিজাব পড়ার কারণে কোন নারীকে লাঞ্ছিতা হতে হবেনা, যৌতুকের করুণ বলি হতে হবেনা কোন নারীকে, ঘরে বাইরে নারী পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে চলতে পারবে, ইভটিজিঙের শিকার হয়ে কোন ছাত্রীর পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার আশংকা থাকবেনা অথবা ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবেনা, শুনতে হবেনা আর কোন নির্যাতিতার মা-বাবার করুণ আর্তনাদ, তাহলে আমি বলবো নারীর এই স্বাধীনতা আজো অর্জিত হয়নি। বরং দিন দিন নারী এসব ক্ষেত্রে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হচ্ছে। এ কথা বলার কারণ হলো আজ থেকে পাঁচ বছর আগে পত্রিকার পাতায় এতো ধর্ষণের খবর ছিলোনা, ইভটিজিং নামক এক জঘন্য সামাজিক ব্যাধির অস্তিত্ব ছিলোনা, চার বছরের কোন বাচ্চা ধর্ষিত হওয়ার খবরও ছিলোনা । এখন হয়তো নারীবাদীদের কেউ কেউ এটা ভেবে আত্মশ্লাঘা অনুভব করতে পারেন যে পাঁচ বছর আগে তো কোন নারীর এভারেস্ট জয়ের রেকর্ড ছিলো না। তাদেরকে বলবো- আজ থেকে শত বছর পরেও বাংলাদেশের কোন নারী এভারেস্টের চূড়া জয় করতে না পারলেও কারোর কোন ক্ষতি হবেনা। হাজার নারীর এভারেস্ট জয় কি একজন ধর্ষিতার সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারবে? এভারেস্টজয়ী একজন নারীকে নিয়ে যতটা মাতামাতি করা হয় আমাদের সমাজে, একজন ধর্ষিতার প্রতি ততটা সহানুভূতি প্রদর্শন করা হয়না।
ভুলেও একথা ভাবা ঠিক হবেনা যে আমি আমার লেখার দ্বারা নারীর উন্নয়নের বিরোধিতা করছি। কেউ যদি ভেবে থাকেন তাহলে রাত জেগে এই লেখা লিখার কষ্ট পুরোটাই বৃথা যাবে। দিন দিন নারী এগিয়ে যাচ্ছে আবার পিছিয়েও যাচ্ছে বহুগুন। সভ্য জাতি হিসেবে যদি আমরা মাথা উঁচু করে দাড়াতে চাই তাহলে নারীর এগিয়ে যাওয়ার পথকে মসৃন করতে হবে এবং যে কারণগুলোর কারণে নারী পিছিয়ে যাচ্ছে সেগুলোকে গলা টিপে হত্যা করতে হবে। নজরুল বলেছেন- কোন কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারী/ প্রেরণা দিয়েছে,শক্তি দিয়েছে বিজয়লক্ষী নারী।
আমরা পশ্চিমাদের নাম শুনলেই খানিকটা দিশেহারা হয়ে যাই। নানানভাবে তাদের অনুকরণ করতে চেষ্টা করি। তাদের দেয়া বিভিন্ন কনসেপ্ট কে অমৃত ভেবে গলাধঃকরণ করতে চাই। সিডো আইনের প্রণেতা যে দেশ, যুক্তরাষ্ট্র,সে দেশেও নারী পুরুষের বৈষম্য দেখলে অবাক হতে হয়। একই পোস্টে চাকরি করে একটা মেয়ে একটা ছেলের সমান বেতন পায়না। যুক্তরাষ্ট্রে প্লেনের পাইলট যদি মেয়ে হয় তা যাত্রীদের জানানো হয়না। জানানো হলে যাত্রীরা বেঁকে বসতে পারে।গত ১০০ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে কোন মহিলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়নি এবং আগামী ১০০ বছরেও যে হবে সে সম্ভবনাও খুব কম। আর তাদের দেয়া বস্তাপচা শ্লোগান নিয়ে আমরা মেতে থাকি।
আমাদের এশিয়ার দেশ চীন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তারা অনেকদূর এগিয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে আমেরিকার সাথে টেক্কাও দিচ্ছে। চীনে মায়েদের পেটে ভ্রুনটি মেয়ে শিশুর ভ্রুন নিশ্চিত হওয়ার সাথে সাথেই তারা তা নষ্ট করে ফেলে। এ কারণে চীন সরকার বাধ্য হয়ে সে দেশে অ্যাবরশন নিষিদ্ধ করেছে। এই একবিংশ শতাব্দীতে সভ্য হিসেবে যারা পরিচিত তাদের এই বৈষম্যকে পাঠক আপনি কি হিসেবে দেখবেন?
হুমায়ূন আহমেদের ‘উঠোন পেরিয়ে দু’পা’ বইতে পড়েছিলাম-সে এবং তার কয়েকজন বন্ধু পরিবার নিয়ে থাইল্যান্ডে বেড়াতে গেছে। বন্ধুদের মাঝে একজনের স্ত্রী প্রেমিকের সাথে ‘আপন নীড়ের’ উদ্দেশ্যে উড়ে গেছে। হুমায়ূন আহমেদসহ অন্যরা তাদের স্ত্রী বাচ্চাদের সাথে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আর ঐ বন্ধু বেচারা ঘুরে একা। থাইল্যান্ড দেশটি land of prostitution নামে পরিচিত। এ দেশে একাকীত্ব ঘুচানো কোন ব্যাপার না। টাকা ছাড়লেই সঙ্গিনীর অভাব হয়না। সেও ৫০০ বাথের বিনিময়ে একজন সঙ্গিনী যোগাড় করলো। মেয়েটি অল্পক্ষণের মধ্যে সবার সাথে ভাব জমিয়ে ফেললো। হুমায়ূন আহমেদের আরেক বন্ধু তার বাচ্চাকে একটা খেলনা গাড়ি কিনে দিলো। মেয়েটা বাচ্চাটিকে বললো-বাবু তোমার গাড়িটাতো খুব সুন্দর। দাম কত? জবাব এলো ৫০০ বাথ। তখন মেয়েটি ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে বলেছিল-me and toy same same !আমি আর এই খেলনা গাড়িটা সমান? হুমায়ূন আহমেদ লিখেছে-তারপর যে ক’টা দিন সেখানে ছিলাম আমার কানে শুধু মেয়েটির সেই করুণ কথা কয়েকটি বাজছিল-me and toy same same! মানবতার কী করুণ পরাজয়!
এর নামই কি নারী স্বাধীনতা? এটাই কি নারীর প্রগতি?
বিচারের ভার পাঠক আপনার উপর………………।
(আমার এই লেখা নারী স্বাধীনতা বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর নয় বরং নিজেই এক জ্বলন্ত প্রশ্ন) …।
2 টি মন্তব্য
মন্তব্য করতে হলে লগ ইন করুন।
কনভার্টার
নাটক, টিভি, বেপর্দা বন্ধ করে ইসলাম ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করলেই সব কিছু ঠিক হয়েছে।
শুভ্র সমুজ্জ্বল